৩২ বছর পর কুমিল্লা বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ, চলছে আধুনিকায়ন
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০১-০৮-২০২৬ ০২:৩১:৫১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-০৮-২০২৬ ০২:৩১:৫১ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
দেশি-বিদেশি শিল্প-কারখানাতেও ঠাসা। আছে বিমানবন্দর। তবে ৩২ বছর ধরে এ বিমানবন্দরে ওড়েনি কোনো বিমান। তবে সচল রয়েছে বন্দরের কার্যক্রম।
এ বন্দর থেকে প্রতি মাসে সরকার আয় করছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব। রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড ও এয়ারক্রাফটের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য টাওয়ারে ভিএইচএফ সেট করলে এ বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচলে বাধা থাকবে না বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ তালিকায় কুমিল্লা বিমানবন্দরের নামও রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাকি সাতটি হলো বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), খানজাহান আলী (বাগেরহাট) এবং পটুয়াখালী বিমানবন্দর।
কুমিল্লা বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেউরা-ঢুলিপাড়ার পাশে স্থাপিত হয় কুমিল্লা বিমানবন্দর। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে সেনাবাহিনী এ বিমানবন্দর ব্যবহার করত। একই বছর বন্দরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এরপর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর বিমান ওঠানামা করে এ বন্দরে।
কিছুদিন পর যাত্রীসংকটে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৯৪ সালে ফের বিমানবন্দরটি চালু করা হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না হওয়ায় মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এয়ারলাইন্সগুলো বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দেয়। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক কোনো ফ্লাইট চালু না থাকলেও মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো চালু ছিল এ বন্দরে। এরপর গত ৩২ বছর ধরে এ বন্দরে প্লেন না ওড়লেও সচল রয়েছে কার্যক্রম। কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে জনবল রয়েছে ২৪ জন।
এদিকে বিমান ওঠানামা না করলেও এই বন্দরের ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের বিমান থেকে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে সরকার। প্রতিদিন এ বন্দর থেকে সিগন্যাল ব্যবহার করে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি প্লেন আন্তর্জাতিক আকাশপথে চলাচল করে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ৭৭ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিমানবন্দরটিতে এখন ভুতুড়ে পরিবেশ। হঠাৎ দেখে যে কেউ বোঝার উপায় নেই, এটি একটি বিমানবন্দর। অধিকাংশ এলাকায় চাষ করা হয়েছে গরুর ঘাস। ভেতরে রয়েছে ছোট ছোট একাধিক পুকুর। টেক-অফ ও ল্যান্ডিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে বহু আবাসিক ভবন। জনবসতি গড়ে ওঠায় ভবিষ্যতে বিমান চলাচলে বাধা হবে বলে মনে করেন কর্তৃপক্ষ।
রানওয়ের পিচ উঠে পাথরের কণা ভেসে উঠেছে। জন্মেছে আগাছা। তবে সচল রয়েছে ডিভিওআর ও ডিএমই-এর সিগন্যাল। এখান থেকে বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৫-৩০টি বিমান দৈনিক সিগন্যাল ব্যবহার করছে। বেশি চলাচল করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান। আগরতলা বিমানবন্দরে যাওয়া বিমান এই রুটে চলে। এছাড়া রয়েছে ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরের বিমান।
এ বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করতে বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টরা। বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে তাদের। অধিগ্রহণেরও ঝামেলা নেই। প্রয়োজন রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার সার্ভিস ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের জনবল। বর্তমানে বিমানবন্দরে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তিন শিফটে কাজ করছেন।
বিমানবন্দর-লাগোয়া কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। যেখানে দেশি-বিদেশি ৪৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদন করছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কুমিল্লা ইপিজেড থেকে রপ্তানি হয়েছে ৯০২.২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৫৬৫.৮৫ মিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮১৪.৮২ মিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭৯০.৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭১১.৩৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
এ ছাড়াও কুমিল্লা প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এক নামে পরিচিত। গত পাঁচ বছরে এই জেলা থেকে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গিয়েছেন সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি মানুষ। জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ গিয়েছেন ৭৬ হাজার ৩৩১ জন, ২০২৪ সালে ৯২ হাজার ৯১১ জন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫২০ জন, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯৭ জন এবং ২০২১ সালে জেলা থেকে ৬৮ হাজার ৫৮৬ জন।
এসব কর্মীর অধিকাংশকেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়—দুটিই বাড়ে। স্থানীয়দের দাবি, কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে এ অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।
একই দাবি কুমিল্লা ইপিজেডের একাধিক ব্যবসায়ীর। তারা জানান, বিমানবন্দর চালু হলে ইপিজেডে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগকারী আসতেন। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হতো। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যাতায়াতের কথা বিবেচনা করে কুমিল্লা বিমানবন্দর যেন পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়, সরকারের কাছে সেই দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে দীর্ঘদিন কুমিল্লা বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকায় ক্ষুব্ধ কুমিল্লার প্রবাসীরাও। বিমানবন্দর থাকা সত্ত্বেও এর কার্যক্রম অসম্পূর্ণ থাকায় নিয়মিত বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন তারা। তাদের দাবি, প্রবাসী-অধ্যুষিত কুমিল্লাবাসীর প্রাণের দাবি, বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা হোক।
কুমিল্লার ইতিহাসবিদ ও গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, কুমিল্লা বিমানবন্দর ভৌগোলিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে কেবল মানুষের চলাচলই নয়, পণ্য পরিবহন, পর্যটন ও প্রবাসী যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে এ বিমানবন্দরের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিগন্যালসহ কার্যক্রম এখনো সচল রয়েছে। এ বন্দর থেকে সরকারের আয়ও হচ্ছে নিয়মিত। সে হিসেবে দেশের কোথাও নতুন একটি বিমানবন্দর চালু করার জন্য যে বিনিয়োগ দরকার, এ ক্ষেত্রে সামান্য কিছু বিনিয়োগেই কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা সম্ভব। তাই বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, সার্বিক বিবেচনায় পুনরায় বিমানবন্দরটি চালু করে কুমিল্লাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করুন।
কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ডা. আজম খান নোমান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কুমিল্লায় বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা সময়ের দাবি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ থাকবে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার।
কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, বিমানবন্দরটি সরকারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দৈনিক ২৫-৩০টি বিমান আমাদের ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহার করে। এটি একটি আন্তর্জাতিক বিমান রুট। এর মাধ্যমে প্রতিবছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আসে। বর্তমানে আমরা ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তিন শিফটে এখানে কাজ করছি। বর্তমানে বিমানবন্দরে নেভিগেশনাল যন্ত্রের আপডেট কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরটি নতুন করে চালু করতে হলে রানওয়ের কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড, এয়ারক্রাফটের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য টাওয়ারে ভিএইচএফ সেট করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। এগুলো হলেই বিমানবন্দর দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলে আর বাধা থাকবে না। তবে সমস্যা হলো, নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই বিমানবন্দরের চারপাশে বহু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকেই এখনো নির্মাণ করছেন। আগামীতে যেন বিমানবন্দর এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে কোনো আবাসিক ভবন নির্মাণ না করতে পারে, আমরা সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছি।
বন্ধ বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর একটি প্রস্তাব ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স